কবি জয়দীপ চট্টোপাধ্যায় এর কবিতামালা

কবি জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়, জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়, কবিতামালা


বর্তমান সময়ে যে সকল কবিদের কবিতা মানুষের মুখে মুখে ফিরে তাদের মধ্যে কবি জয়দীপ চট্টোপাধ্যায় অন্যতম। কবি জয়দীপ চট্টোপাধ্যায় অধুনা ধাঁচের কিছু কবিতা প্রকাশ করলাম।


ফড়িং 
জয়দীপ চট্টোপাধ্যায় 

একটি ফড়িং লাফায় ঘাসে একটি ফড়িং হাসে
একটি ফড়িং আকাশ জুড়ে ওড়ার স্বপ্নে ভাসে ৷

একটি ফড়িং বড়ই একা গাইতে যে চায় গান
একটি ফড়িং সকাল হলেই ক্রিকেট খেলায় প্রাণ ৷

একটি ফড়িং সাঁতার শেখে একটি ফড়িং জুডো
একটি ফড়িং শপিংমলে হারিয়েছে কাল লুডো ৷

একটি ফড়িং বইমেলাতে আলোর ছবি আঁকে
একটি ফড়িং সন্ধ্যেবেলায় ই-মেল পাঠায় মাকে ৷

একটি ফড়িং কার্টুন দ্যাখে দেশকে ভালোবাসে 
একটি ফড়িং সেল্ফি মোডে সপ্তসুরে ভাসে ৷

একটি ফড়িং দুঃখী এখন স্কুলগুলো সব বন্ধ
একটি ফড়িং স্বপ্ন আঁকে ফিরবে গতির ছন্দ ৷

একটি ফড়িং প্রচার করে মাস্কে ঢাকে মুখ
একটি ফড়িং অনলাইনে এক্সামে নেই সুখ ৷

একটি ফড়িং হাজার মনের স্বপ্নতে ভরপুর
একটি ফড়িং মিলন মন্ত্রে উতল সমুদ্দুর ৷

একটি ফড়িং বসুন্ধরায় সবুজ প্লাবন চায়
একটি ফড়িং দিনবদলের পদ্য লিখে যায় ৷


স্বপ্নের কথামালা 
জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

কাঁটাতার বাধা একদিন মুছে যাবে
সব মানুষের অবারিত হবে গতি
কেটে যাবে রাত উত্তরণের ভােরে
মানুষ আসবে মানুষের কাছাকাছি ৷

স্মৃতিঘর জুড়ে সময়ের কথামালা
গুমরিয়ে কাঁদে দহন স্মৃতির নদী
হাউই সুখের লক্ষে মানুষ আজও
বারুদ গুলিতে শান্তির বিস্মৃতি ৷

হিরােশিমা তার নিধনের স্তুপে আজও পােড়া বিবেকের অগ্নিও লেলিহান
আমরা তবু তাে স্বপ্ন আশায় বাঁচি
জাগবে মানুষ গাইবে আলাের গান ৷

আগামী মানুষ আনবে সােনালি দিন হানাহানি কথা ঠাঁই নেবে ইতিহাসে
গাইবে মানুষ জীবনের আলোগান
হাতে হাত রেখে বিশ্বাসে ভালােবেসে ৷


স্বপ্নকবিতা
জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

আমি সেই কবিতার স্বপ্ন দেখি
যা মানুষের কাছে জ্যোৎস্না হয়ে ঝরে পড়বে
ধূসর মনে অনির্বাণ প্রত্যয় হয়ে
জেগে থাকবে আবহমান
মানুষকে দেবে সম্প্রীতির মহার্ঘ মন্ত্র। 

ক্ষয়ে যাওয়া ভালােবাসার ডিজিটাল পৃথিবীতে
একটু প্রশান্তি চায় মানুষ।
গভীর অনিশ্চয়তার আবর্তে সময়-শাসনে।
ছুটে চলেছে সেলফি জেনারেশন।
তাদের চারপাশে শুধুই হানাহানি..বারুদ...দূষণ... 
মুখােশ পরা মানুষের বিরামহীন নগ্নতা... 

চিরায়ত কবিতার শরীর ছুঁয়ে বেঁচে থাকে বৈদুর্য আলাে...শুদ্ধতার স্বপ্নবীজ...
শুধু শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে নয় অক্ষরপ্রতিমার দিগন্ত ছুঁয়ে
আমরা পরিশুদ্ধ হতে চাই
নিতে চাই আলাের শপথ। 

প্রিয় পৃথিবীর জন্য কবিতা শরীরে
রেখে যেতে চাই সূর্যের দীপ্তি, চাদের স্নিগ্ধতা....
শুদ্ধতার স্বপ্নবীজ...


একদিন ঘুম ভেঙে 
জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

একদিন ঘুম ভেঙে দেখবাে 
খাঁচা থেকে উড়ে গেছে সব পাখি 
সীমান্তে সীমান্তে চলছে রাখীবন্ধন 
স্বয়ংক্রিয় রাইফেল সরিয়ে উর্দিধারী সৈনিকেরা
মানুষকে শেখাচ্ছে ভালােবাসার গান কৃষ্ণচূড়া বিছানাে পথে নিশ্চিন্তে হেঁটে যাচ্ছে স্বপ্ন 
হাজার শিশুর মুখে খুশির অপার্থিব আলাে.. 

একদিন ঘুম ভেঙে দেখবাে 
প্রতিটি মানুষের মধ্যে সূর্যের দীপ্তি চাঁদের স্নিগ্ধতা
প্রত্যয়ী মানুষ নিজেকে ছাড়িয়ে নিজেই পাড়ি দিয়েছে অসীমে...
একদিন ঘুম ভেঙে দেখবাে


রক্তগোলাপ
জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

প্রথম পরিচয়েই তুমি হাতে তুলে দিয়েছিলে রক্তগোলাপ ৷
প্রথম উচ্চারনেই তুমি বুঝিয়ে দিয়েছিলে
তোমার আসা সূর্যনদীর দেশ থেকে ৷
নিভন্ত দিনে রোদ্দুর ছড়িয়ে বলেছিলে
এসেছো তুমি সকলের মুখে রামধনু দেখতে ৷
তোমার নিরুচ্চার লাবণ্যে ধ্বনিত হচ্ছিল
কুয়াশাভেদী আলোকিত প্রত্যয়,সুগন্ধ ৷

ফেলে আসা পথে 
এখনও লেগে আছে শতাব্দীর পলিমাটি 
শব্দরঙের তুলি নিয়ে ভাষাহীনা
দুচোখে বহমানা নদী...

মানচিত্রের সামনে স্থির
ক্যানভাসের রঙ ছুঁয়ে কেবলই উঠে আসেছে
তাজা রক্তের দুঃস্বপ্ন...দীর্ঘশ্বাস...

মায়া আগুন সমুদ্রে তোমার
ক্যানভাসে তুমি রেখে যেতে চাও
উত্তরণের সোনালি স্বপ্ন, ভালোবাসার বীজমন্ত্র ৷


আমাদের নজরুল
জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

আমাদের তুমি কবি নজরুল সংগ্রামী রূপকথা
অক্ষর দিয়ে হৃদয় আসনে হাস্নুহানার গাথা ৷

আমাদের তুমি বিদ্রোহী কবি সাম্যের কারিগর
গান কবিতায় স্বপ্ন এঁকেছো চিরায়ত সুন্দর ৷

কঠিন কঠোর জীবন ছুঁয়েছে বিপন্নতার মেঘ
ধর্মান্ধতা হানাহানি শুধু বাড়িয়েছে উদ্বেগ ৷

তোমার সৃজনে মুখরিত ছিল নিপিড়িত জনগন
গর্জে উঠেছো প্রতিবাদী স্বরে আলোসন্ধানী মন ৷

উন্নত শির মাটির মানুষ মানবতাই পথ
পুরাণ কোরান এক দেহে লীন স্বপ্ন ভবিষ্যত ৷

শ্যামাসঙ্গীত ইসলামী গানে আর্তি প্রতিধ্বনি
সম্প্রীতিভোর কবি নজরুল আলোর পরশমণি ৷

পুণ্যভূমি চুরুলিয়া গ্রাম প্রিয়তার এক নাম
ঐক্য-শপথে জানাই তোমাকে নন্দিত সম্মান ৷


কবিতা নিয়ে মিছিলে বেরোবো একদিন
জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

কবিতা নিয়ে মিছিলে বেরোবো একদিন
রাজপথ থেকে হেঁটে যাবো লালমাটি
আলোর শপথ গর্জে উঠবে জেহাদে
উদাত্ত স্বরে প্রত্যয় পরিপাটি

পরশমণির ছোঁয়ায় জাগবে মানুষ
ভুবনগ্রামে একটাই হবে জাতি
ইতিহাস থেকে জীবনের দিশা নিয়ে
হবেই মানুষ সফরের প্রিয় সাথী

অত্যাচারীর হাজার মিনার ডঙ্কা 
ঘৃণার শ্যাওলা মেখেছে আবহমান
মিছিলে মানুষ মাটিতে রেখেছে পা
প্রতিবাদী হাতে মহাকাশ খান-খান

একটা জীবন বহু জীবনের দ্বার
অমোঘ মন্ত্র তোমার অজানা নয়
বন্ধুর পথ হাতে হাত বেঁধে রেখো
তুচ্ছ বিপদ তুচ্ছ অজানা ভয়

গহণে তোমার অমরাবতীর আলো
ব্যস্ত সময়ে হয়তো ভুলেছ তাকে
অবসরে যদি তার চোখে রাখো চোখ
বাড়াও দু'হাত রাঙা নদীটির বাঁকে

কবিতামন্ত্রে উল্কি আঁকবো সকলে
বারুদ সরিয়ে ফোটাবো গোলাপ লাল
ঐক্যের সুরে জনগণেশের গানে
তোমার দু'পায়ে হাটবেই মহাকাল

কবিতা নিয়ে মিছি…


অনুবাদ 
জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

নিবিড় চয়নে তুলে আনা শব্দে
অনুবাদ করতে চাই তোমাকে...

তোমার চোখের নীল অতলান্ত
মেধার অনুচ্চার বিকিরণ
স্বপ্নের রামধনু উড়ান
ঠোঁটের অলীক ইশারা
উষ্ণ শরীরের প্রত্ণ ঘ্রাণ
চিবুকের কালো তিল
আমার কবিতায় মিশেছে বারবার ।

আমি বুঝি, তোমার বহিরঙ্গ অনুবাদ সহজ
আমি তোমাকে অনুবাদ করতে চাই
অস্তিত্বের মর্মমূলে, চৈতন্যের জাগ্রত সত্তায় ।

তোমাকে যত দেখি মুগ্ধতায়
পরতে পরতে খুলতে থাকে রহস্যের দরজা...

আমি জানি, তোমার নীরবতার ভাষা
সহস্র শব্দের থেকেও ধ্বনিময়...
তোমার শুভেচ্ছা অন্তঃসলিলার মতো আমোঘ...
ভালোবাসা শিশিরের মতো পবিত্র...

আমি অনুবাদের অছিলায় কখনো 
ডুব দিই অতলান্তে...
দেখি সময়প্রবাহে বদলে গেছে পোশাক
একই আছে তোমার সুগন্ধ...

জন অরণ্য থেকে ডাক দিলে
আমি ঠিক চিনতে পারি তোমাকে ।
তুমি নির্দ্বিধায় আমার দিকে হাত বাড়াও ।
তোমাকে অনুবাদ করতে করতে একদিন
আদিম প্রকৃতিতে হারিয়ে যাই আমি ।


উষ্ণতা
জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

স্বপ্ন নিয়ে অক্ষর সাধনা, পরিক্রমা।
ভীড় করে নানা রঙের টুকরো টুকরো ছবি
পংক্তিমালা ছুঁয়ে জেগে ওঠে
সময়ের আনন্দঘন মুহূর্ত
অব্যক্ত যন্ত্রণার দীর্ঘশ্বাস...

জীবন নামের এক রহস্য নদীর পথ ধরে
চলতে চলতে অভিজ্ঞতার আলোয়
অস্তিত্বকে নতুন করে খোঁজার চেষ্টা
হাজারও মানুষের ভিড়ে মিশে থাকা
কখনওবা প্রথাপথ ছেড়ে
অন্য অন্বেষণে ডুবে থাকা 

রাতের তারাময় আকাশের নীচে
একা দাঁড়িয়ে উপলব্ধির প্রান্তভূমি ছুঁয়ে
জেগে ওঠে মহাপৃথিবীর সঙ্গে
এক নিবিড় একাত্মতা - ক্ষুদ্র আমি তুচ্ছ নই।

মায়াময় জগৎ - সংসারে ফিরে-ফিরে আসি।
মুগ্ধতায় তাকাই।
তুমি আমার আকাশে
মহামান্বিত হয়ে জেগে থাকো।
তোমাকেই ধ্রুবতারা মেনে হেঁটে যাই
নতুন অন্বেষণে...

মনে মনে বলি হে ধরিত্রী 
দিন দিন উষ্ণতা বাড়ুক সম্পর্কের
পৃথিবীর নয়।
পৃথিবীতে করো আনন্দতীর্থ
সৃষ্টির অনন্ত বসত।

১০

তুমি জানো না
জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

তুমি জানো না
তোমার বুকের অতলে রয়েছে 
এক গোপন সরোবর
আর সেখানে ফুটে রয়েছে
জ্যোৎস্নামাখা পদ্ম৷

তুমি জানো না
তোমার চোখের তারায় রয়েছে
অপার্থিব মায়াপ্রদীপ
আর সেখানে থরে থরে সাজানো 
রঙিন স্বপ্নমালা...

তুমি জানো না
তোমার লাবণ্যময় যুগল শিখরে
ঘুমিয়ে আছে মায়া-আগুন
আর সেখানে শুধুই অবগাহনের
রামধনু ইশারা...

লক্ষ আলোকবর্ষ দূর থেকে
ছুটে আসা, তোমার কাছে
শুধু তোমারই কাছে...
তুমি জানো না...

১১

না-লেখা চিঠি
জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

তোমাকে না-লেখা চিঠিগুলো ঘুমের মধ্যে আমাকে জাগিয়ে রাখে ।

স্বপ্নের নীল নির্জনে তোমার সাথে প্রায়শই কথা বলি 
নাগকেশরের মধ্যাহ্ন ছায়ায় প্রকৃতি গালিচায়
তোমার কোলে মাথা রেখে খুঁজে চলি অন্য এক প্রশান্তি ।
কার্শিয়াং-এর মেঘের মতো লুকোচুরি  তোমার চলাচল বিস্মিত করে আমাকে ।
প্রকাশ আর অপ্রকাশের মায়া খেলায় তোমাকে কখনো আলেয়া বলে ভুল করি । 
অথচ দূরে গেলেও মন থেকে যায় তোমারি কাছে ।
তোমাকেই ছুঁয়ে...

বলেছিলে তুমি ভালোবাসার নিজস্ব একটা আলো আছে ।
এই বর্ণালী চোখে দেখা যায় না 
একমাত্র হৃদয় দিয়ে অনুভব করা যায় ।

ভালোবাসার রসায়ন বুঝি না আমি ।
খুঁজে পাই না সেই রহস্য আলোর ঠিকানা...
কিন্তু অন্ধকারের মধ্যেও আমরা পরস্পরকে স্পষ্ট দেখতে পাই 
পৃথিবীর সমস্ত কোলাহলের মধ্যেও 
একে অপরের স্পন্দন অনুভব করি ।
উল্কার কনভয় তেড়ে এলেও আমরা স্থির থেকে 
নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন দেখি...।

১২

গোপন ঠিকানায় 
জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

শহরে প্রিয়তায় গড়ায় এক চিলতে ছাদ
যেখানে তুমি আগামীর কথা ভাবো
যেখানে খোঁজো ফেলে আসা মুহূর্ত
যেখানে তুমি তারাদের সঙ্গে মিতালি পাতাও
যেখানে তুমি ভালোবাসার কথা ভাবো
যেখানে সাধনা করো চিরায়তের

ওই একফালি সাড়ে তিন তলার সুদৃশ্য ছাদ
তোমাকে দিয়েছে আকাশ হবার মন্ত্র৷

কি চাও অভিসারী মেঘেদের কাছে!
কি চাও রুপোলি বৃষ্টির কাছে!
ভরা জ্যোৎস্নায় একান্তে কার কথা ভাবো!
নীলরাতে তোমার অসমাপ্ত কবিতা শোনাও তারাদের!
চিঠি পাঠাও অনন্ত নীলিমায়!
চিলেকোঠার ঘরে বিছানার নিচে লুকিয়ে রাখো
সেতুবন্ধনের গোপন দলিল!

আকাশের নিচে তোমার ওই গোপন ঠিকানায়
ভুল করে কবিকে ডেকো না কখনো

দমকা হাওয়ায় সুগন্ধি আঁচল উড়িয়ে
কবির সাথে হেঁটোনা কখনো
খোলা আকাশের নিচে
কবি তোমার চোখে চোখ রাখলে বৃষ্টি নামতে পারে
কেঁপে উঠতে পারে মাটি...
তুমুল বৃষ্টিতে ভেসে যেতে পারে সব...

ভুল করে কবিকে কখনো তোমার গোপন ঠিকানায় ডেকো না৷